একটি সাদা কাফনের সফর নামা – (৩য় পর্ব)

– অধ্যাপক আকতার চৌধুরী

৩য় পর্ব
কক্সবাজার শহরে পড়ালেখা করি। অনেকদিন পর গ্রামে বেড়াতে গিয়েছি। গ্রামের বাড়ীর সামনেই আমার ছেড়ে যাওয়া রুমখা চৌধুরী পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় । স্যারদের সালাম করতে ও স্কুলটাকে দেখার জন্য গেলাম। ভালুকিয়ার নুরুল ইসলাম স্যার । ইনি আমার সম্পর্কে ফুফাত ভাইও । আমাকে পেয়ে ওয়ানে ক্লাস নেয়ার জন্য পাঠালেন। জীবনে প্রথম ক্লাস । নার্ভাসনেস কাজ করছিল । তারপরও নিজেকে সামলে নেয়ার জন্য যথারীতি রোল কল করছি । ভারি দুষ্ট পোলাপাইন । আমাকে পাত্তা দেবে না।

রোল নম্বর এক – প্রেজেন স্যার , রোল নম্বর দুই – উপস্থিত স্যার , রোল নম্বর তিন – আছম স্যার (এটা চাঁটগা ভাষায়), রোল নম্বর চার- হাজির জনাব, রোল নম্বর পাঁচ – লব্বই স্যার। এ রকম প্রতি উত্তর পাচ্ছিলাম।
পূর্ব পরিচিত পাড়াইল্লা ছেলে হওয়ায় তারা স্যার ডাকতেও সংকোচ বোধ করছিল। একেকজনের একেক ধরনের হাজিরা প্রদানের স্টাইল দেখে কিছুটা হাসিও পাচ্ছিল ।  একই গ্রামের ছেলে আর গেস্ট হিসেবে বকাসকা করার সাহস পাচ্ছিলাম না । এটাকে মেনে নিয়ে কোন রকমে ক্লাসটা সেরে ছিলাম। কিন্তু নতুন শব্দ ‘লব্বই’ টা আমার কাছে একবারে আনকোরা । নতুন শব্দ। শিশুদের কাছে পাওয়া । শেখাতে গিয়ে নিজেও একটা নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হলাম। কিন্তু একদিন টিভি পর্দায় দেখলাম লাখো লাখো মানুষ ‘লাব্বাইকা’ ধ্বনি দিয়ে পাগলের মত ছুটে চলেছে আল্লাহর পানে । তাহলে কী ‘লব্বই’ বলা ছোট শিশুটি আমাকে এমন কিছু ইংগিত করেছিল – তোমার প্রভূর কাছে তোমাকেও একদিন এমনভাবে হাজিরা দিতে হবে।

আজকে আমিও আল্লাহর ঘরের ছাত্র । ক্লাসে হাজিরা দিতে যাচ্ছি। ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা ’ তালবিয়া যত পড়ছি, বাড়ছে হৃদয়ে কান্নার সুর। আমি সুর পাগল মানুষ । অনেকদিন থেকে এই তালবিয়া ঘরে বাইরে একা একা মনে মনে কখনো স্বউচ্চ শব্দে চর্চ্চা করেছি। অসম্ভব ধরনের আবেগ  , আকুতিতে ভরা । ভেতর থেকে মোচড় দিয়ে উঠা এক মন্ত্র। প্রভুর কাছে গরহাজিরা থেকে বাঁচার আকুতি!

ইহরামের কাপড় পরার পর যখনই নিয়ত করা শেষ করেছি তখন থেকে তালবিয়াহ পাঠ শুরু ৷ দাড়িয়ে,বসে, শুয়ে, চলন্ত অবস্থায় সর্বাবস্থায় পড়া যায়। কিন্তু হজ্বের ফ্লেভার ওমরাহতে পাওয়া যায় না। তারপরও একা একা মনে মনে পড়ে যাই। কোথাও অপরের সাথে সুর মিলাই।

‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা,লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইকা। ইন্নাল হামদা ওয়াান নেয়ামাতা লাকা ওয়াাল মুলকা লা-শারীকা লাক।
এর অর্থ হলো, হে আল্লাহ, আমি হাজির আছি, আমি হাজির আছি। আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির আছি। নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও নেয়ামত আপনারই এবং সমগ্র বিশ্বজাহান আপনার। আপনার কোনো শরীক নেই। (সহীহ বুখারি)।

আমি বলব , আপনি হজ্বে কিংবা ওমরাহতে যাওয়ার আগেই এই তালবিয়া নিজে নিজে চর্চা করুন – আপনার মন প্রফুল্ল হয়ে উঠবে । আল্লাহর ঘরের হাজিরা দিতে আল্লাহ আপনাকে তৌফিক দেবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস । আপনিও গরহাজিরা থেকে বেঁচে যাবেন।

চলবে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.